২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম শহর শিকাগোতে তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে শহরের রজার্স পার্ক এলাকার নর্থ ক্লার্ক স্ট্রিটের একটি অংশের নামকরণ করা হয় ‘জিয়াউর রহমান ওয়ে’ হিসেবে। শিকাগো সিটি কাউন্সিল কোনো বিতর্ক ছাড়াই প্রস্তাবটি অনুমোদন করে, যা ছিল একজন বাংলাদেশি নেতার প্রতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এক যুগ পর, ২০২৬ সালে তাঁর ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশজুড়ে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তাঁর অবদান নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন তাদের আনুষ্ঠানিক বার্তায় ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম)’কে স্মরণ করে ১৯৭১ সালের সেই ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণার কথা উল্লেখ করেছে, যা বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের পথে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিল।
ভারতের গণমাধ্যমগুলোও বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাংলা সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল’ উল্লেখ করেছে, জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনের বার্তা ছিল এক ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
আন্তর্জাতিক পরিসরে জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি হলো দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১৩তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে তাঁকে প্রথম সার্ক পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের উপস্থিতিতে তাঁর পক্ষে এই সম্মাননা গ্রহণ করেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সেই অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শওকত আজিজ জিয়াউর রহমানকে সার্কের প্রতিষ্ঠাতা ও স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। অন্যদিকে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং মন্তব্য করেন, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী চিন্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর সম্মানের পরিধি আরও বিস্তৃত। মিসরের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘অর্ডার অব দ্য নাইল’-এ তাঁকে ভূষিত করা হয়। এই সম্মান বিশ্বের বিশিষ্ট রাষ্ট্রনায়ক ও মানবকল্যাণে অবদান রাখা ব্যক্তিদের প্রদান করা হয়। নেলসন ম্যান্ডেলা, সম্রাট আকিহিতো, রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও মার্শাল টিটোর মতো বিশ্বনেতারাও এই সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।
জিয়াউর রহমান যুগোস্লাভিয়ার সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘অর্ডার অব দ্য যুগোস্লাভ স্টার’-ও লাভ করেন। তৎকালীন যুগোস্লাভ নেতা মার্শাল টিটো তাঁর নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে এই বিরল সম্মাননায় ভূষিত করেছিলেন।
এছাড়া উত্তর কোরিয়া সফরকালে তিনি দেশটির সর্বোচ্চ সম্মানসূচক খেতাব ‘হিরো অব দ্য রিপাবলিক’ অর্জন করেন। তাঁর নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মান প্রদান করা হয়েছিল। ফিদেল কাস্ত্রো ও মুয়াম্মার গাদ্দাফির মতো নেতারাও একই সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পাশাপাশি নিজ দেশেও তিনি সমানভাবে সম্মানিত। মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীর উত্তম’ লাভ করেন। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়, যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মাননা।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং আত্মমর্যাদার রাজনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, রাষ্ট্রচিন্তা ও নেতৃত্ব আজও লক্ষ কোটি মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।
দেশকে গভীরভাবে ভালোবেসে তিনি শুধু বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেননি, অর্জন করেছিলেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও সম্মান ও শ্রদ্ধা। তাই বলা যায়, জিয়াউর রহমান ছিলেন এমন এক রাষ্ট্রনায়ক, যার কর্ম, চিন্তা ও আদর্শ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বমঞ্চেও সমাদৃত হয়েছে। তাঁর অবদান ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
লেখক: কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের প্রথম সচিব (প্রেস)

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ মে ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন