প্রিন্ট এর তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬
চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ থেকে থানার নিরাপত্তাবলয়ের ভেতরে সাংবাদিকের ওপর হামলাা
দৈনিক রূপায়ণ অনলাইন ||
কুমিল্লার দেবিদ্বার থানার ভেতরে দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ পত্রিকা ও দৈনিক সকাল'র দেবিদ্বার প্রতিনিধি সোহরাব হোসেনের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে থানার একটি অফিসকক্ষের সামনে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক সোহরাব। এ ঘটনায় দেবিদ্বার পৌর এলাকায় ‘রেড ৯৯৯’ নামে পরিচিত একটি কিশোর গ্যাংয়ের কথিত নেতা রায়হান ওরফে ‘শুটার রায়হান’-এর নাম সামনে এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে হামলা, সাংবাদিকদের হুমকি, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ভুয়া রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের একাধিক অভিযোগও তুলেছেন বিভিন্ন ব্যক্তি।সাংবাদিক সোহরাব হোসেনের অভিযোগ, একটি বিষয়ে অনুসন্ধান এবং দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) বক্তব্য নেওয়ার জন্য তিনি থানায় যান। সেখানে যাওয়ার খবর পেয়ে রায়হান তাঁর ওপর হামলা চালান। সোহরাবের দাবি, দেবিদ্বারের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর নাম ব্যবহার করে রায়হান বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করেন। তাঁর কাছে তিনটি অস্ত্র রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন সোহরাব। এসব অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও পুলিশের বক্তব্য নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তিনি থানায় গিয়েছিলেন বলে জানান। তবে কথিত অস্ত্রগুলোর বিষয়ে কোনো নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।সোহরাব হোসেন আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার সময় তাঁর সঙ্গে থাকা সহকর্মী সাংবাদিক তোফায়েল আহমেদকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরে থানার বাইরে থাকা স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী পরিস্থিতি মীমাংসার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যস্থতার উদ্যোগের পরও পরিস্থিতির সন্তোষজনক সমাধান হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। থানার বাইরে বের হওয়ার পর সাংবাদিকদের দেখে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন সোহরাব।থানার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একজন সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠায় স্থানীয় সাংবাদিক মহলে উদ্বেগ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা কোথায় ছিলেন, তাঁদের উপস্থিতিতে কী ঘটেছিল এবং থানার সিসিটিভি ক্যামেরায় পুরো ঘটনা ধারণ হয়েছে কি না—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে। ঘটনার প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটনে সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিকেরা।এদিকে দেবিদ্বার পৌর এলাকায় ‘রেড ৯৯৯’ নামে পরিচিত একটি কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে রায়হানের সম্পৃক্ততার অভিযোগও আলোচনায় রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাংবাদিকের দাবি, জাতীয় নির্বাচনের সময় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত থাকার উদ্দেশ্যে রায়হান অর্থের বিনিময়ে একটি ভুয়া প্রেস কার্ড সংগ্রহ করেছিলেন। নির্বাচনের পর সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে প্রভাব বিস্তার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে বলে দাবি করেন ওই সাংবাদিক।রায়হানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলাকার কলকারখানা, অবৈধ স্থাপনা, রেস্তোরাঁ ও দোকানপাট থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন অভিযোগকারী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভুক্তভোগীর দাবি, সাংবাদিকদের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যের নাম বা প্রভাবের কথা উল্লেখ করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের পর অর্থ নেওয়া হলেও পরে আর যোগাযোগ রাখা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। দেবিদ্বারের কয়েকজন ব্যবসায়ীর দাবি, এনসিপির নাম ব্যবহার করে দোকানপাট থেকে চাঁদা আদায় এবং ধার নেওয়া অর্থ ফেরত না দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।একজন ভুক্তভোগী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে রায়হানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেন। ওই পোস্টে দাবি করা হয়, আগে তিনি ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বর্তমানে এনসিপির পরিচয় ব্যবহার করতেন। অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির এক জ্যেষ্ঠ সদস্য দাবি করেন, রায়হান তাঁদের দলের কোনো সদস্য নন। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসার পর দলীয় নেতাকর্মীরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি বলেও জানান ওই নেতা। রায়হানের বিরুদ্ধে থানাসংক্রান্ত একটি সমস্যা মীমাংসা করে দেওয়ার কথা বলে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি। তাঁর দাবি, স্থানীয় সংসদ সদস্যের এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির কাছ থেকে এ বাবদ অর্থ নেওয়া হয়েছিল।পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি থানায় যোগাযোগ করলে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা যানান, বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা, থানার নাম ভাঙিয়ে তিনি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ করেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। থানার ভেতরে সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সাংবাদিক নেতারা তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁরা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে রাজপথে কর্মসূচি দেওয়া হবে। তাঁদের মতে, সংবাদ সংগ্রহ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির কারণে কোনো সাংবাদিককে হামলা কিংবা প্রাণনাশের হুমকির মুখে পড়তে হলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। বিশেষ করে থানার অভ্যন্তরে এমন ঘটনার অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।এ বিষয়ে দেবিদ্বার–ব্রাহ্মণপাড়া সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিন জানান, কিশোর গ্যাংয়ের নেতাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। থানার ভেতরে এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। রায়হানের বিরুদ্ধে শিগগিরই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক রুপায়ণ